🎀মমতাময়ী জননী (নাটিকা)🎀

Mohammed Tajul Islam
By -
0

                                                 🎀মমতাময়ী জননী🎀

                                 মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম 


( মুখবন্ধ:-প্রকৃতি অবারিত ধারায় সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছে মানবজাতির প্রতি । তাঁর সাহায্য, বদান্যতা   বৈষম্যহীন I ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান। প্রতিদানে কিছু পাবার আশা করে না। কিন্তু  তাঁর ,এ দান বা সুবিধা গুলির সিংহভাগ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে সমাজের ক্ষমতাবান মানুষ তথা ক্ষমতাবান দেশ , নিয়ম-নীতি, আন্তর্জাতিক  আইনের তোয়াক্কা না করে, নানান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকরে ধরণীর  বুকে। যেমন :-বাঁধ , সুইস গেট, কালভার্ট,অপরিশোধিত বর্জ্য, সীমানা  বর্ধিতকরণ ,সীমান্ত হত্যা ,ইত্যাদি। শান্তিময় আবাসযোগ্য  বসুধায়  বপন করে কৃত্রিম অশান্তির বীজ। এর বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিবাদী কন্ঠ ,কল্পনায় এঁকে "মমতাময়ী জননী" নাটিকায় রুপায়নের চেষ্টা করেছি মাত্র। জানিনা কতটুকু পেরেছি ; তা সুবিচারের  দায়িত্ব পরম শ্রদ্ধেয় পাঠকদের উপরে নাস্ত করলাম। নাটিকাটি  পড়ুন , আপনার ভালো লাগতেও পারে !  সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে, সবার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করে ,  বিদায় চাইছি, ধন্যবাদ ! সবাই ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন, ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন !)


                                                     প্রথম দৃশ্য


মাঝ রাত , ভরা নদী।  উজান থেকে ভাটির দিকে স্রোত বয়ে চলেছে। স্রোতের অনুকূলে পালতোলা নায়ের পালে হাওয়া ধরেছে। চারিদিক গভীর নিস্তব্ধতা,কেবল স্রোতের কুলকুল মিষ্টি ধ্বনি কানে ভেসে আসছে I ভরা পূর্ণিমার  নদীর নির্মল জলে নিশিনাথ হাঁসছে। বাঁধের উপর সারিসারি গাছগুলি মাথা নূয়ে গভীর নিদ্রা মগ্ন। দূরের গ্রামগুলি সাদা কুয়াশার চাদরে দিগন্তে মিশে গেছে। এমন সময় নৌকার গলুই-এ  হাল ধরা মাঝেকে উদাসীন দেখে, নদী জিজ্ঞাসা করল। 

 

নদীঃ ‌ মাঝি, কেমন আছো ভাই? একা একা আপন মনে কি ভাবছো? 


মাঝিঃ(গভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে অচেনা কন্ঠের আওয়াজ শুনে , কিছুটা আৎকে  উঠে বলল ) কে ,কে তুমি ? কে কথা বলছো? 


নদীঃ (মৃদু কন্ঠে) আমি নদী,ভয় পেয়েছো নাকি ?  তোমাকে আনমনা  দেখে, তোমার সঙ্গে ভাব জমানোর সাধ জাগলো। 


মাঝিঃ ও তুমি  !  হাঁ,ভালোই আছি, ভাই। কেবল সংসারের আপনজনদের কথা ভেবে , মনটা খারাপ লাগছে। 


নদীঃ তোমার সংসারে কে কে আছে ভাই? 


মাঝিঃ (মলিন কন্ঠে) বিধবা মা, এক মাত্র সন্তান, খোকন ও স্ত্রী। ঘর ছেড়েছি মাস পেরিয়ে গেছে, অসুস্থ মা কেমন আছে জানি না। ছেলেটার মুখ মনের আয়নায় ভাসছে, তাকে দেখার জন্য প্রাণটা ছটফট করছে। 


নদীঃ-তাই বুঝি উদাস মনে হাল ধরে আছো ? কিন্তু মাঝি সাবধান  !  সামনে ত্রিবেণী, বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন, নায়ের গতি সামলে ,সঠিক গন্তব্যের দিক নির্ণয়ে ভুল করোনা। 


মাঝিঃ তোমাকে অনেক ধন্যবাদ! তুমি আমায় সচেতন করলে, আমার ভ্রম  ঘুচালে ! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ !  ভাই নদী, তুমি সর্বদা পরের উপকার করো, সেবাব্রতই তোমার ধর্ম। তোমার নিজের মনে কি কোন দুঃখ নেই? 


নদীঃ-দুঃখের কথা বলছো? এ কথার উত্তর অন্য একদিন তোমায় বলবো। এখন থাক। 


ওই যে, ওই যে, কে  যেন আমার দিকে এগিয়ে আসছে  !  আমাকে কলঙ্কিত করতে ! আমার ললাটে  অমঙ্গলের  কালিমা লেপে দিতে আসছে ! আমায় সেদিকে যেতে হবে, তার সাথে কথা বলতে হবে। আজ তবে বিদায় !

 বিদায় বন্ধু , বিদায় ! 



                                                                   দ্বিতীয় দৃশ্য


নদীঃ-(এক অজ্ঞাত কুলশীল  নারীকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো) কে তুমি? 

কেন এই গভীর রাতে ,এলো কেশে, পাগলিনি বেশে, গলায় কলস বেঁধে আমার কিনারে এসে দাঁড়িয়েছ ? 


কুলোশীল নারীঃ-আমি এক অপয়া  নারী । আমি মরতে এসেছি ! তোমার গহনে ডুবে মরতে চাই ! 


নদীঃ কেন তুমি মরবে?  কি তোমার দুঃখ?  আর তোমার মৃত্যুতে আমি বা কেন কলঙ্কিত হতে যাবো?


কুলশীল নারীঃ- তোমার এত প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই? আমি দিতেও   চাইনা। আমি মরতে এসেছি ! আর মৃত্যুতে আমার সব দুঃখ মোচন হবে  -এটাই আমার শেষ কথা !


 (জোছনার ছটা পাদপ পাতার ফাঁক দিয়ে মেয়েটিরই অঙ্গের উপর ঝরছিল। তার শুভ্র  কায়ার অপরূপ সৌন্দর্যে যৌবন উছলে পড়ছিল । এ  নিশ্চয  কোন কুলীন বংশের দুলালী। দুঃখ-কষ্ট সইতে না পেরে ,এ পথে  পা বাড়িয়েছে।)


নদীঃ-মরতে চাও বুঝলাম। কিন্তু কেন? জানতে পারি কি এমন সিদ্ধান্তের কারণ?  আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। দেখি, যদি আমি তোমার কোন উপকারে আসতে পারি। 


নারীঃ-জানি, তুমি খুব সদয়, পরোপকারী। সেবাই তোমার ধর্ম।  কিন্তু তোমার সেবা বা উপকার, কিছুই নেবার ইচ্ছা আমার নেই। আমাকে আমার পথে চলতে দাও। এ পথেই আমার মুক্তি ! এছাড়া আমার কোন উপায় নেই ! 


নদীঃ তবু তোমাকে বলতেই হবে, কি তোমার যন্ত্রণা? কি তোমার মনবেদনা? এ আমার আকুল মিনতি ! 


নারীঃ ঠিক আছে, এত করে যখন বলছ ! তবে শোনো, ওই যে জোছনায় ধবধব করছে, মাথা জাগানো বড় ইমারতখানি। ওটাই আমার শ্বশুরালয়। বাবা, বড় শখ করে ধনী পরিবারে আমাকে বিবাহ দিয়েছিল। 


আমার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। সংসারে দুই ভাই-বোন ও মা বাবা, মোট চারজন। বাবা একজন সৎ মানুষ। খুব সাধারণ জীবন যাপনে  অভ্যস্ত । ভাই বোনদের মধ্যে আমি বড়, ছোট ভাই, বাবা যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে , সে বিদ্যালয়ের  পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র।


আমি এস এস সি পাশ করে সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি । হঠাৎ একদিন কয়েকজন অপরিচিত লোক বাবার খোঁজে আমাদের বাড়িতে  এলো, আমার ছোট ভাই তাদের বৈঠকখানায় অভ্যর্থনা জানাল । আগন্তুক ব্যক্তিবর্গ বাবার সঙ্গে আলাপচারিতার আগ্রহ প্রকাশ করলে, বাবা তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন । তারপর কুশলাদি  বিনিময় ও কথাবার্তা বললেন। দীর্ঘ আলাপচারিতার  এক পর্যায়ে তাদের একজন বললেন, রামভদ্রপুরের ইমরুল কায়েস চৌধুরীর একমাত্র পুত্র, কলেজ করিডরে আপনার কন্যার দর্শন লাভ করেছে। সে আপনার কন্যার পানিপ্রার্থী। বাবা কিছুটা অবাক হলেন, বিস্ময় ও উৎকণ্ঠা সামলে , শান্ত ও  গম্ভীর কন্ঠে বললেন:-এ প্রস্তাব নিয়ে আপনাদের কে পাঠিয়েছে? 

আগন্তক:-না, মশাই,ভুল বুঝবেন না । চৌধুরী সাহেবের ছেলে আমাদের পাঠাননি । ছেলে, পিতার কাছে তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আর পিতা, চৌধুরী সাহেব নিজেই আপনার কন্যার সথে  তাঁর পুত্রের বিবাহের পয়গাম ,আমাদের মাধ্যমে আপনার  নিকট পাঠিয়েছেন। 


জানেন তো, চৌধুরী সাহেবের  ২০০ বিঘার  মত আবাদি জমি, বাঁশবাগান, পুকুর -পুসকুনি ,ইত্যাদি মিলে আড়াইশো ছাড়িয়ে যাবে। শহরে নিজস্ব ইমারত , ব্যবসা-বাণিজ্য তো আছেই ! দু - দশ  গ্রামের মধ্যে তাঁর সাথে টেক্কা দেওয়ার মতো ধনী ব্যক্তি একটিও নেই। এবার যদি আপনি সম্মতি দেন অর্থাৎ চৌধুরী সাহেবের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। তবে শুভ কার্য  সম্পন্ন হতে বেশি সময় লাগবে না। 

মাস্টার সাহেব ভেবে দেখবেন, সুযোগ জীবনে একবারই আসে, বারবার আসে না। 

তাছাড়া দেয়া নেয়া বা যৌতুকের কথা ভাবছেন? চৌধুরী সাহেব আপনার কাছে দাবি করে কিছুই নেবেন না। খুশি মনে আপনি যা দিবেন, তাতেই চলবে। 


বাবা দীর্ঘ সময় ধরে , ধৈর্যের সাথে ,তাদের বক্তব্য  শ্রবণান্তে বললেন, আপনাদের সব কথাই আমি শুনলাম, সবই ভালো !  আপনারা যা বলেছেন সব কিছুই আমার মঙ্গলের জন্য বলেছেন ! কিন্তু এখন  আমি আমার মেয়েকে বিবাহ দিব না।  সে  সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে, সে লেখাপড়া করবে। আর আমার কথায় আপনারা  মনে কষ্ট নিবেন না, এত বড় ধনী পরিবারে, মেয়েকে  সম্প্রদান করতে  চাই না আমি । বাবার কথায় তারা নিরাশ হয়ে পড়ল। বাবাকে বোঝাবার  জন্য নানান যুক্তি উপস্থাপন করলো  । বাবা ,তাদের  ধন্যবাদ জানিয়ে ,অন্দরমহলে চলে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর উনারা প্রস্থান করলেন। 


নদীঃ-তোমার গল্প তো বেশ ভালো লাগছে  হে  !  বল ,বল থামলে কেন ? 


কুলশীল নারীঃ-এটা গল্প নয়, এটা কঠিন বাস্তবতা ,নিরেট সত্য ! আমার জীবনে ঘটে যাওয়া পুঞ্জিভূত স্মৃতির বর্ণনা। 


নদীঃ-এখানে  ইতি টানলে হয়তো, আজ  এই অবস্থায় তোমাকে আমায় দেখতে হতো না।


নারী:-তবে বাঁকিটুকু বলি, শোনো। 


-এর এক বছর পর, একদিন চৌধুরী সাহেব তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে নানান উপঢোকন সংগে বাবার সামনে এসে উপস্থিত হলেন। এবং পুত্রের সম্বন্ধের প্রস্তাবটি নিজেই পেশ করলেন। চৌধুরী সাহেবের প্রতিটি কথায় তাঁর বন্ধুদের আকণ্ঠ সমর্থন বারবার ধ্বনিত হতে লাগলো। একপর্যায়ে চৌধুরী সাহেব বাবার দুটো হাত চেপে ধরে বললেন, ভাই, বড় আশা করে নিজেই আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে আমাকে বিমুখ করবেন না। বাবা তাঁর অনুরোধ ফিরাতে পারলেন না। রাজি হয়ে গেলেন। 

চৌধুরী সাহেবের আদরের পুত্রের সাথে আমার বিবাহ সুসম্পন্ন হল।


চৌধুরী সাহেব একজন সৎ মানুষ, আজও সৎ। কিন্তু তার কুলাঙ্গার পুত্র, মাতাল ,নেশাগ্রস্ত ও চরিত্রহীন। আর এরূপ উশৃংখলতা নাকি তাদের পারিবারিক কৃষ্টির অন্তর্গত, শ্বাশুড়ির বক্তব্যে বারংবার তা ফুঁটে উঠত। তিনি ছিলেন, পুত্রের অসামাজিক কার্যকলাপের নীরব সমর্থক ,অন্তরে পুষতেন  অন্যের সম্পদের প্রতি গভীর  লিপ্সা।

  তার এই  নির্মমতা ও ব্যভিচার, আজ আমাকে এখানে দাঁড় করিয়েছে।


বাবা, আমার সুখের জন্য তাঁর স্বল্পায়ের চাকুরী  জীবনে অর্জিত অর্থকরী ও সম্পদের সিংহভাগ সমর্পণ করেন আমার শ্বশুরালয়ে। আমার সুখের জন্য। কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টা অসারতায় পর্যবসিত হয়েছে   আর আমাকে দাঁড় করিয়েছে  মৃত্যুর মুখোমুখি। (নদীকে উদ্দেশ্য করে) বলুন! বলুন! এছাড়া, আমার জন্য অন্য কোন পথ কি খোলা আছে? 



(পূর্ণিমার চাঁদ পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। পূর্ব দিগন্তে আঁধার কেটে আলোর আভা প্রসারিত হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মসজিদে, ফজরের আজান হাঁকবে মুয়াজ্জিন!)


নদীঃ (বেশ কিছু সময় নিরব থেকে,   শান্ত কণ্ঠে বললো)  মানুষের মন পরিবর্তনশীল । আজ যাকে তুমি খারাপ বলছো , কাল নয় তো পরশু, সেও ভালো হয়ে যেতে পারে। তুমি ধৈর্যশীল হও ! তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে । ধৈর্যশীল  মানুষকে সবাই পছন্দ করে।- এখন বাড়ি ফিরে যাও । গ্রামের লোকজন জেগে ওঠার সময় হয়েছে । এ অবস্থায় তোমাকে কেউ দেখে ফেললে ; সমাজে তোমার বদনাম ছড়াবে । আমার অনুরোধ, এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে, ঘরে ফিরে যাও। 


নারীঃ  তুমি আজ  আমাকে আমার পথ থেকে বিচ্যুত করলে। আমাকে ফিরিয়ে দিলে। কিন্তু এখানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে, এমনটি ভেব না ।

যা করছো, তা  সাময়িক। আচ্ছা চলি। তবে জেনে রেখো, এরপর আবার যেদিন ফিরে আসবো, সেদিন আর আমাকে ফেরাতে পারবে না।

-তোমার সাথে কথা বাড়াতে চাই না।

-বিদায়! 





                                                    তৃতীয় দৃশ্য

                                                           


(নদী এই অসহায় মহীয়সী নারীর  ফিরে যাওয়ার পথে  চেয়ে রইল, যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে দৃষ্টির নাগালে আবদ্ধ রাখা গিয়েছিল। বাংলার  সহজ - সরলা , অসহায় ও নিষ্পাপ নারীদের উপর স্বামী ও শাশুড়ি কর্তৃক   নির্যাতন  ও অবহেলা  তাকে চরম ব্যথিত করল।


এরপর  ক্লান্ত, শ্রান্ত ,  ভরাকান্ত ও বিধ্বস্ত দেহে , চিরাচরিত নিয়মে সামনে  ক্রোস  দুই এগোতেই চোখে পড়ল -,এক বৃদ্ধ । শীর্ণ দেহ, বেঁকে, সমস্ত শক্তি লাগিয়ে, জীর্ণ কুঠিরের আসবাবপত্রাদি কাঁধে লয়ে, কখনো বা টেনে হিছরে অদূরে নিরাপদ জায়গায়  স্তুপ করছে। ঢেঁউয়ের ধাক্কায় ধীরে ধীরে বৃদ্ধের জীর্ণ কুটিরখানি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গাত্র বস্ত্রহীন, কোমরের লুঙ্গি  কুঁচে  বিহবল মূর্তিতে প্রাণপণে ছোটাছুটি করছে। মাথার চুল, ললাটের ভ্রু  বয়সের ভারে শণ -পাকা হয়েছে। দু চোয়ালে দুই একটি দাঁত থাকলেও থাকতে পারে।


যেখানে তৈজসপত্রাদি ও অন্যান্য জিনিসপত্রের  স্তুপ করছে, সেখানে বৃদ্ধের  সহধর্মিণী  আপাদমস্তক মলিন শাড়ির আচ্ছাদনে ঢেকে, বিনাকিসুরে নিজের অদৃষ্টের বর্ণনা করছে। আঁখি দ্বয়ে অঝোঁরে জল পড়ার  মত শারীরিক অবস্থা  নেই। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে-দু জনেই বিহবল হয়ে পড়েছে।)



বৃদ্ধঃ-(নদীকে উদ্দেশ্য  করে, শোকে,গভীর মনতাপে ,কাঁদো কাঁদো সুরে) তুমি আমার সব সহায় সম্বল কেড়ে নিলে !  তিন কানি আবাদি  জমি, পৈত্রিক ভিটেমাটি, নিদান কালের শেষ আশ্রয়, গোরস্থান, কেড়ে নিয়ে আমায় পথের ভিখারি বানালে  ! এখন আমি কি করবো? কোথায় যাব? জীবনের বাঁকি কটা দিন আমাকে বুঝি শহরের  ফুটপাতে , রেলস্টেশনে  যাযাবরের মত দিনাতিপাত করতে হবে, খোদা! ( হু হু হু কান্না, নাকের জল ছুড়ে ফেলে)

 বজ্রকন্ঠ:-তুই সর্বনাশী ! 

তুই রাক্ষসী ! 

তুই সর্বভুক  ! 

তুই মানবজাতির অভিশাপ !

 তোর কোনদিন ভালো হবে না  ! 


নদী:-  (চরম  ধৈর্যের সাথে বৃদ্ধের অভিযোগ গুলি শ্রবণ করছিল ! কিন্তু এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। তাকে উদ্দেশ্য করে ব্যক্ত, শেষের কয়েকটি বিশেষণ,-নদীর শরীরের শীতল রক্তকে কঠিন উত্তাপে টগবগিয়ে তুলল, বলল ।)  থামুন ! থামুন ! এবার একটু থামুন ! বন্ধ করুন আপনার মিথ্যে অভিযোগ !

 যে অভিযোগে আমি অভিযুক্ত নয়, বৃথা চেষ্টায় কেন তা আমার গায়ে লেপিয়ে দিচ্ছেন ! 

নিজেদের অসৎকর্মের দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন কেন?

 

আপনারাই  ভেঙেছেন সব নিয়ম-নীতি। নিজের শক্তি দ্বারা পরিবর্তন করেছেন প্রকৃতির শাশ্বত রূপ। নিজ স্বার্থ উদ্ধারে অপরকে করেছেন বঞ্জিত। নীতি আদর্শ, ন্যায় বিচার  আপনাদের কাছে মূল্যহীন। ধর্ম -বর্ণের বিভেদ ,  ধনী- দরিদ্রের বৈষম্য সৃষ্টি করে বিশ্ব মানচিত্রকে করেছেন শত সহস্র খন্ডে খন্ডিত। শক্তির মানদন্ডের  নিক্তিতে নিরূপণ করেছেন প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে  ‍ বুড়ো  আঙ্গুল দেখিয়ে , আমার বক্ষে গড়েছেন বিশাল বিশাল বাঁধ, সুইসগেট,ব্রিজ । খাল কেটে নিজেদের সুবিধার্থে পরিবর্তন করেছেন আমার গতিপ্রবাহ। প্রতিবেশী দেশের লক্ষ লক্ষ একর উর্বর আবাদী জমিকে পরিণত করেছেন অনুর্বর মরুভূমিতে। হারিয়ে ফেলেছি আমি আমার নাব্যতা শক্তি। বর্ষার মৌসুমে  ঐ শক্তিধর বড় বড় দেশ গুলি নিজেদের  স্বার্থে ,ব্রিজ, সুইস গেট  খুলে দিয়ে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়  প্রতিবেশী দেশে। সৃষ্টি হয় সেখানে বন্যা , প্লাবনের মত মহা দুর্যোগ, সৃষ্টি হয় কৃত্রিম মহাসংকট। পানি প্রবাহের পথ মসৃণ না হওয়ার কারণে স্রোতের   তোরে ভেঙে যায় নিয়ন্ত্রণ বাধ । নদী-গর্ভে বিলীন হয় শত শত ঘরবাড়ি, গ্রাম -গঞ্জ, স্কুল -কলেজ , হাটবাজার  আরো কত কিছু ,ভাসিয়ে যায় মানুষ, গবাদি পশু ইত্যাদি  । বসতবাড়ি হারানো গৃহহীন মানুষ কর্মের খোঁজে  ভিড়   জমায় বড় বড় শহরে। 

এসবের জন্য কে  দায়ী?

 কে দায়ী? 

বলুন ,বলুন, চুপ করে থাকবেন না। (বৃদ্ধের উদ্দেশ্যে) আমি আর সইতে পারছি না! (কাঁপতে কাঁপতে কান্না জড়িত কন্ঠে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কিছুক্ষণ পর আবার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললো) জীবনের ঊষালগ্নে, পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে কোন এক সময়, বড় বড় পাহাড়ের চূড়ার জলপ্রপাতে জন্ম হয়েছিল মোদের। ব্রত ছিল যতদিন বেঁচে থাকবো ,ততদিন সারা বিশ্বের সকল সৃষ্টি জীবের সেবায় নিয়োজিত থাকবো   । ভাবিনি  কখনো মানুষের  অকল্যাণে মোদের ব্যবহার করা হবে। জননীর পরম স্নেহে সবার মন জুরাবো ! 


কিন্তু হায় ! এ  কি দৃশ্য দেখতে হচ্ছে আজ মোদের ! 


          এ জগতে 

শক্তির জোরে শাসকের চাকা

  স্বার্থের তরে ঘোরে,

মানুষের দ্বারে  শ্যাম্যের বাণী 

কেঁদে কেঁদে ফিরে  মরে I।



”দহন জীবনে মোর  জড়িয়ে গেছে !  নয় তাই  স্নেহময়ী জননী ! হয়েছি আজ  আমি বিদগ্ধ জননী” !


                কিন্তু, না , না ,  না


চাই না এ রূপে ,কুৎসিত স্বরূপে, বিশেষিত হতে 


  ফিরে দাও মোরে , পুষ্পিত ভরে


লুন্ঠিত যা করেছ মরে   ।



বাঁধ  বেড়ী -বাঁধ, ছোট -বড়-গেট]

 গড়েছো যত শত,

 ধ্বংস কর হে,সকল বাঁধা

ফিরে দাও আগের মত।



 শস্য- শ্যামলা সবুজ- বাংলা

     মাঠ ভরা পাকা ধান, 

 মরুর  বক্ষ, সজিব করিব

    গাইবো সবাই গান ।



প্রকৃতি  চলিবে আপন গতিতে

 বহিবে প্রবাহ যত, 

সৃষ্টি কুলকে আপন করিব

মমতাময়ী  জননীর ”মতো ।।


আমি ক্লান্ত,  আমি অবিশ্রান্ত ! আমার  ঘুম পাচ্ছে , দু”চোখ মুজে আসছে ।

 আমি ঘুমিয়ে পড়লাম ।


                                                   

                                                     চতুর্থ দৃশ্য



শরৎকাল শেষ হতে চলেছে। হেমন্তের আগমন  প্রকৃতির   দারে  কড়া নাড়ছে । খরস্রোতা  নদীর   বেগ স্তিমিত  হয়ে এসেছে । নদী বক্ষে জেগে উঠেছে ছোট ছোট  অসংখ্য  চর । প্রভাতে  সেথায় ,ঝাঁকে  ঝাঁকে নানা বর্ণের পাখির বিচরণ ,  মধুর কলকাকুলিতে ভরে উঠেছে  বালুচর । কিচিরমিচির  শব্দে হঠাৎ  নদীর ঘুম ভেঙ্গে গেল ।  তখন সূর্যি মামা পুব আকাশে আলো ছড়ানো শুরু করেছে ,মুক্ত হাওয়ায় কাশফুলের মাথাগুলি নৃত্যের  তালে তালে দুলছে  । নদী সেদিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে প্রকৃতিমার অবারিত সৌন্দর্য  উপভোগ করছিল । দূরে অস্পষ্ট কে যেন  হাওয়ার প্রতিকূলে নায়ের গুণ টেনে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে । যখন সেটি দৃষ্টির নাগালে এলো, এ আর অপরিচিত কেহ নয় ! এই সে মাঝি ।


নদীঃ( ছুটে গিয়ে জিজ্ঞাসা বলল) মাঝি  !  মাঝি ! তুমি কেমন আছো ভাই ! কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হল ! তুমি ভালো আছো  ভাই ! তোমায় দেখে মনটা খুশিতে ভরে গেল, প্রাণটা ,জুড়িয়ে গেল !

 এ যাত্রায় তোমার ব্যবসা বাণিজ্য কেমন হলো,ভাই  ? 


 মাঝিঃ- ( হাওয়ার প্রতিকূলে গুন টানতে টানতে বাঁকা দেহে পিছনে মুখ ফিরিয়ে) আমি ভালো নেই ভাই ।  কখন যে বাড়ি  পৌছবো  জানি না ? ওদের জন্য প্রাণটা ছটফট করছে !


 নদীঃ কেন, বাড়ির কোন দুঃসংবাদ পেয়েছ নাকি ?


 মাঝিঃ ঢাকা বিক্রমপুরে ১০০ বস্তা আলু কিনে ,যখন বস্তাগুলি নৌকায়  বোঝায় করছিলাম ।

 তখন বড়দিয়া ,নড়াইল মোকামের একজন পরিচিত ব্যবসায়ী, খোকার নিজ হাতে লেখা, একটি পত্র আমার হাতে ধরিয়ে দেয় । পত্রে খোকা লিখেছে, বাবা তুমি কবে বাড়ি ফিরবে ? কতদিন তোমায় দেখিনি ! দাদীমার অসুখ বেড়েছে ! মার হাতে টাকা - কড়ি নেই । দাদিমার জন্য ওষুধ কিনতে পারছে না । তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো !  আমার মন খারাপ ! তোমাকে শুধু দেখতে ইচ্ছে করছে ! ( বলতে বলতে  আদরের  একমাত্র  সন্তানকে , দূরে থাকার বিরহে,  দু চোখ দিয়ে   ঝর ঝর করে অশ্রু পড়তে লাগলো ।


নদীঃ- তুমি কাঁদছো ! তুমি কাঁদছো ভাই ! তুমি কেদনা, আমি মানুষের কষ্ট সইতে পারিনা !  তুমি শান্ত হও ! 

তুমি শান্ত হও ভাই ! আমার মন বলছে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা তোমার নিকটজনদের কুশলে এবং নিরাপদে রেখেছেন । তুমি শান্ত হও ভাই ! শান্ত হও  !


  মাঝিঃ( আঁখিদ্বয়  মুছতে  মুছতে) তুমি যা বলেছ , খোদাতালা যেন তাই করেন। তারা যেন নিরাপদে থাকে । 


 নদীঃ  আমাদের প্রথম দেখার দিন, নাও ভরা মাল ছিল । মালামাল নিয়ে তুমি দক্ষিণা পথে যাচিছলে । সেগুলি কি ছিল ভাই ? 

আর সেগুলি কি  বা করলে ? 

জানতে পারি কি তোমার কাছে ? 


মাঝিঃ ও গুলি ছিল, খৈল ,  মটর কলাই, কাঠবাদাম,আলু ও আরো অন্যান্য শস্য  । নবগঙ্গা ধরে কাটাখাল হয়ে মাগুরার চিত্রা নদী তীরবর্তী লোহাগড়া, নলদি, মিঠাপুর,  খলসি,মোহাম্মদপুর, বিনোদপুর ইত্যাদি  হাটগুলি ও  তার নিকটবর্তী গ্রাম গুলিতে ঘুরে ঘুরে ওই মালগুলো ক্রয় করেছিলাম । এবং বিক্রয় করতে দক্ষিণের গড়াই নদী দিয়ে রূপসা ও মালসা  খাল হয়ে, যাত্রাপুর, ফকিরহাট , মালসা ইত্যাদি হাটগুলিতে গিয়েছিলাম ।


নদীঃ তাতে কেমন লাভ হয়েছিল ভাই ?


 মাঝিঃ মন্দ নয়, এবার ভালোই ব্যবসা হয়েছে । হাটে খৈলের খুব চাহিদা ছিল । মাল বিক্রি করতে বেগ পেতে হয় নি ।


নদীঃ খুব ভালো লাগলো, আনন্দে বুক ভরে গেল ! অনেকদিন পর মানুষের তৃপ্ত মন  ও প্রফুল্ল চিত্তের সাক্ষাৎ পেলাম । অন্তরে পুঞ্জিভূত দুঃখগুলো দূর হলো !

( দুজনের আলাপচারিতার  এক পর্যায়ে নৌকা নির্দিষ্ট গন্তব্য অর্থাৎ ঘাটে ভিড়লো । সহকর্মীদের একজনকে মহাজনের নিকট হিসাব-পত্রাদি বুঝিয়ে দেবার নির্দেশ দিয়ে এবং নিজের মালপত্র ,তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো ) ।


নদীঃ- মাঝি   !  মাঝি ভাই ! তুমি চলে যাচ্ছ ভাই !

  নিকটজন ভেবে, বন্ধু হয়ে আমি তোমার সুখ-দুঃখের সব খোঁজ খবর নিলাম । তোমার কি একবারও জানতে ইচ্ছে করলো  না ? মাঝখানে দিনগুলো আমার কেমন কেটেছে ? তোমার সাথে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন তুমি আমার ক্লান্তিহীন বয়ে চলা জীবনের সুখ -দুঃখ, হাসি -কান্নার গল্প জানতে চেয়েছিলে । আজ তোমার সাথে আবার দেখা হল । ভেবেছিলাম অনেক কিছু বলবো ,কিন্তু—------------------?


 মাঝিঃ আমাকে ভুল বুঝনা ভাই ! তুমি নিশ্চয়ই আমার মনের কষ্ট বুঝতে পারছ ! 

আমাকে যেতে দাও ভাই ।

 আমাকে ক্ষমা কর !

 আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি !

 তবে কথা দিচ্ছি,

বিশ্ব প্রতিপালক, যদি আমায় বেঁচে রাখেন । তবে আগামী ভাদ্রের ভরা পূর্ণিমায় , ঝিরি  ঝিরি হাওয়ায়,দক্ষিণের পথে পালতোলা নায়ে, দাঁড় হাতে,  নিরালায় গলুইয়ে বসে, তোমার সনে প্রাণ খুলে আলাপ  করবো । তোমার জীবনের ঘটে যাওয়া সব স্মৃতি- বিস্তৃতির বর্ণনা শুনবো ।

 এবার আমায় যেতে দাও ভাই ! 

 বিদায় !  

বন্ধু বিদায় ! 



                                                                 সমাপ্ত ।

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)