🎀 একটি শান্ত বিকেল 🎀
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
জীবন কর্ম ,ফেলে আসা দিন, ছোট ছোট চাওয়া -পাওয়া,আসা- যাওয়া একই বৃন্তে গাঁথা গতিময় এই জীবনখানি I দিনভর শিশুদের কলকাকলিতে মাতিয়ে থাকা, দিন শেষে শান্ত বিকেলে বাড়ি ফেরা I
হেমন্তের শেষভাগ, ধূলিময় মেঠো পথ, নীল আকাশ, ধরাধামে হালকা শীতের পরশ I
বালিয়াগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষের ঘড়িতে বিকেল 8টা I পঞ্চম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী, প্রধান শিক্ষক সাহেবের নির্দেশে ছুটির ঘন্টা বাজল I
ছাত্র-ছাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে পরলো বাড়ির উদ্দেশ্যে I আমিও বেরিয়ে পড়লাম , পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম বাড়ির পথে I
বিদ্যালয় থেকে একটু হেঁটেই উঁচু মেঠো পথ, পুরু ধূলিকণার স্তর,উত্তর-দক্ষিণ বরাবর প্রসারিত I ভবিষ্যতে হয়তো বা একদিন পাকা রাস্তা হবে, তাই এতোটা উঁচু I রাস্তার দু'ধার বরাবর কিছুটা শক্ত, দূর্বা ঘাসে আচ্ছাদিত I একদল শিক্ষার্থী দক্ষিণা পথ ধরে চলল অন্য দল উত্তরমুখী- আমার সঙ্গে, আমি উত্তরমুখী দলের কেন্দ্রবিন্দু হলাম এবং চলতে শুরু করলাম I
একজন শিক্ষার্থী বললোঃ- আপনার একটি সাইকেল দরকার I আপনার বাড়ি কতদূর, স্যার ?
আমি বললামঃ- তা ৬/৭ কিলোমিটার I
শিক্ষার্থীঃ- নিশ্চয়ই, হেঁটে যেতে সন্ধ্যা লাগবে !
সাইকেল কিনেননি কেন,স্যার ?
আমি বললামঃ- তোদের যে পথ- ঘাট , এর উপর সাইকেল চালানো যায় ?
অন্য শিক্ষার্থী বললোঃ- সাইকেলের চাকা বালুর মধ্যে বসে গিয়ে আপনি চিত- পটাং , হাঁ , হাঁ , হাঁ - - - !
দু জন শিক্ষার্থী দৌড়ে পথের ওপার থেকে এপাড়ার আসছিল I তাদের পাদুকার চটাস -চটাস শব্দের সঙ্গে ধূলিকণা গুলিও শূন্যে উড়ছিল I
আমি বললামঃ- এই কি শুরু করলি, ধুলো উড়াচ্ছিস কেন ?
একজন শিক্ষার্থী বললোঃ- ওকে একটা থাপ্পর লাগান , স্যার I ঠিক হবে নি !
অন্যজন বললোঃ- বিনা পয়সার পাউডার , মুখমন্ডলে মাখলে ফর্সা হবে,স্যার !
কিছুদুর পার হয়ে, হাতের ডানে একটি মুড় বটগাছ I পাশ দিয়ে সরু পথটি সবুজে ঢাকা,পাখি ডাকা, ছোট্ট পাড়া বরাবর এগিয়েছে I ৩/৪ জন শিক্ষার্থী বটগাছের ধার দিয়ে সরু পথে নামল , বললোঃ- আসসালামু আলাইকুম স্যার, বিদায় ! কাল আবার দেখা হবে,স্যার !
আজ হাটবার,
আরো ধাপ শ দুই সামনে এগুতেই গ্রাম্য ছোট্ট হাট, নাম তার মাতাসাগর I যেন মাতৃস্নেহের আগার নয়তো বা স্নেহের বন্ধন এখানে সাগরের ন্যায় গভীর, তাই হয়তো নামটি রেখেছিল “ মাতাসাগর” !
জেলেদের জালে ধরা বিল-ঝিলের নানান জাতের ছোট-বড় মাছ পাশে রাস্তার ধারে ডালি গুলিতে শোভা পাচ্ছিল I
গৃহস্থের ক্ষেতের তরতাজা শাক -সবজি গুলো ডালিতে রেখে খদ্দেরের সঙ্গে দর কষাকষি করছিল I
হাট পেরিয়ে আসলাম I হাটে শেষ প্রান্তে, উঁচু পথটি সোজা পূর্বদিকে শহরমুখী বাড়িয়েছে I শিক্ষার্থীর ২০/২৫ জনের দল সেই পথ ধরল I আমি কিছুটা সরু ও নিচু আইল পথের নেমে উত্তরমুখী হলাম I
ওরা বললোঃ- স্যার, চলে যাচ্ছেন ?
আমি বললামঃ- হ্যাঁ, তোমরাও যাও I
আরো কয়েকজন বলতে থাকলোঃ- স্যার, চলে যাচ্ছেন ? স্যার, চলে যাচ্ছেন ?
আমি হাত ইশারায় বিদায় নিলাম !
নিচু জমি পার হয়ে উঁচু ভূমি যাকে ‘ ভিটা-জমি’ বলা হয় I বেশ প্রশস্ত, এর দৈর্ঘ্য প্রায় কিলোমিটার সম শুধু ফুলকপি আর বাঁধাকপির ক্ষেত I মাঠটি বারদুয়ারী নামে পরিচিত I কপির পাতাগুলি বেশ উঁচু, হাটু বরাবর কোথাও বা কোমর বরাবর I সবুজ আর সবুজ, যেন সবুজের সমারোহ ! নিঃশব্দ চারিদিক , ক্ষেতের মাঝ দিয়ে আলপনা আঁকা সরু আইল পথ বেয়ে একা এগোচ্ছিলাম I সবুজ পাতার ছায়া তলে লুকায়িত শীতল হওয়ার স্পর্শে পরম তৃপ্তি অনুভব করছিলাম I
হঠাৎ পানকৌড়ির মত পল্লী কৃষাণীরা ক্ষেতের মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আবার ডুব দিচ্ছিল I ভাবছিলাম, ওরা ওখানে কি করছে? নিকটে একজনকে দেখে বুঝলাম , ওরা নিজেদের গবাদি পশু রাতের খাবার সংগ্রহে, কপি গাছগুলির নিম্নাংশের বুড়ো পাতাগুলি ভাঙছে এবং সেগুলি ডালি ও বস্তা বন্দি করছে I
একবার পিছনে ফিরে তাকালাম I
দূরে , বেশ দূরে , শিক্ষার্থীরা তখনোও দাঁড়িয়েছিল ,কেহ কেহ তখনোও হাতছানি দিচ্ছিল ! আমি অবাক হলাম ! বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ! তাদের ছোট ছোট কমল স্নেহ মাখা হাতগুলি যেন আমার হৃদয়কে বারবার স্পর্শ করছিল ! নিষ্পাপ ও পবিত্র মুখগুলি যেন হৃদয় দর্পণে ভেসে উঠছিল ! সৃষ্টিকর্তাকে কয়েকবার নিরবে গভীর শ্রদ্ধা জানালাম ! বললামঃ- হে প্রভু, তুমি মোরে অনেক সম্মানিত করেছে , অনেক- -- !
সমাজের ধনাঢ়্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের চোখে মোদের পেশাখানি হয়তো বা নিম্নমানের,বর্ণহীন এবং সঙ্গে প্রাপ্তি , আর্থিক অপ্রতুলতা কারণে হিসেবি, কিপটে ও সাদামাটা জীবন যাপনের গ্লানি I পক্ষান্তরে স্নেহের পরম স্পর্শে কচিকাঁচা সোনামণিদের আদর্শ শিক্ষাদানে ,অন্তর জুড়াই অনাবিল প্রশান্তিতে ! এটা সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের একটি ক্ষেত্রও বটে I সেখানে কাজ করার সুযোগ দিয়েছো তুমি, মালিক ! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ – - !
পিছনে একজন হাটুরে ,আসসালামু আলাইকুম মাস্টার সাহেব ,এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে ! ঘুরে মুখোমুখি হয়ে, ওয়ালাইকুম আসসালাম , আর কিছু না বলে আবার হাঁটতে শুরু করলাম I দিঘির সমতল পাড়ের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম ,পায়ের তলায় মট- মট শব্দে ভাংছিল অসংখ্য খোলা-খুলি ( মাটির হাড়ি -পাতিল, থালা ও কলস ইত্যাদির ভাঙা টুকরো ) I শুনেছি কয়েক শতাব্দি পূর্বে এখানে কুমোর পল্লী গড়ে উঠেছিল I তার চিহ্ন স্বরূপ আজও এখানে রয়েছে মাটির তৈজসপত্রের ভাঙ্গা অসংখ্য টুকরো I কিন্তু এখন সেখানে কুমোর বংশের ছিটে -ফোঁটাও নেই I
বামে বিস্তৃত সবুজ কপির মাঠ ,ডানে সুবিশাল দিঘির I একদল পাতিহাঁস দিঘির নির্মল জলে সাঁতার কাটছিল I
দুই,একটি প্যাঁক প্যাঁক শব্দে ডাকছিল ,আর ছোট ছোট ঢেউগুলি কিনারে এসে মিলে যাচ্ছিল I
সামনে আমবাগান, তার মধ্য দিয়ে কুশাডাঙ্গা গ্রামখানি আড়াআড়ি পার হলাম I উপস্থিত হলাম দিগন্তজোড়া শুষ্ক, শস্যহীন ,উন্মুক্ত বিলে I পথ খাটো করার জন্য ভূঁই-আইল , সমতল কিংবা বন্ধুর, নির্বিচারে সোজা হাঁটতে শুরু করলাম I সূর্যাস্তের পূর্বে বাড়ি ফিরতে হবে I আমি একা, হেঁটেই চলেছি I পাখির ডানা মেলানো কালো মোটা রেখার ন্যায় দূরে নিজ গ্রামখানির নিশানায় দ্রুত এগুচ্ছিলাম I ক্ষণকাল ব্যবধানে মাথার উপর , বেশ উঁচুতে , টিয়ে ঝাঁক উত্তরে আপন ঠিকানায় উড়ে যাচ্ছিল I মাঝে মাঝে তাদের টি- টি ডাক কানে ভেসে আসছিল I এগিয়ে চললাম ,আরো দ্রুত এগিয়ে চলাম I ] গোধূলি লগ্নে নেমে আসছিল, সূর্য পশ্চিম কোণে ডুবু ডুবু ! রাখালের দল গবাদিপশু তেড়ে ঘরে ফিরছিল I
পৌঁছলাম নিজ গ্রামে দক্ষিণ প্রান্তে , কয়েকটি বসতির ছোট্ট হিন্দুপাড়া I বাঁশ বাগানে নিচ দিয়ে, ছোট ছোট কুটিরে পিছন ও আঙ্গিনা বরাবর হাঁটছিলাম I আমার বাল্যবন্ধু, পাঠশালা সহপাঠী ,সুকুমার রায় , সুকুমার নামেই পাড়াসুদ্ধ পরিচিত ;একজন ভালো কৃষক I সযতনে লালিত নিজ দুধেল গাভীটির জন্য উঠানের এক কোণে ছোট্ট বাঁশের খোঁটায় কাস্তে উপর খর কাটছিল I আমি বললামঃ- সুকুমার ভালো আছিস, বন্ধু ! সহসা ওয় আমার দিকে তাকালো , কিছু একটা বলতে চাইছিল ! কিন্তু ওর সহধর্মিনী উঠানে উনুনে পাশের ছোট বাবুটিকে আগলে রান্না করছিল , উচ্চস্বরে হাসিমুখে বললো, দাদা নেমন্তন্ন নেন , রাতে আমাদের গরিবালয়ে খাবেন ! আমি হাসিমুখে বললাম, নেমন্তন্ন দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ, বৌউদি !
যখন বাড়িতে পৌছলাম, বাবা অদূরে খুলির উপকন্ঠে, বদনায় পানি নিয়ে অজু করছিল মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য I আমি খোলা গলির ভেতরে দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলাম -- I


Post a Comment
0Comments